বৃহস্পতিবার । ১৯শে মার্চ, ২০২৬ । ৫ই চৈত্র, ১৪৩২

রোজার শিক্ষা প্রতিফলিত হোক বাস্তব জীবনে

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী

রমজান মাস শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাস নয়। এটি ছিল আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, সহানুভূতি এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মাস। মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরও ফরজ করা হয়েছিল যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার (বাকারা: ১৮৩ )। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় রোজার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তাকওয়া হাসিল করা। প্রকৃতপক্ষে তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয়ে সকল প্রকার গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। আমরা প্রত্যেকে যদি তার নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে পরকালের জবাবদিহিতার সামনে রাখি, তাহলে দুর্নীতি, অন্যায় ও জুলুম করতে হাত কাঁপবে। মনে হবে এই তো আল্লাহ সবকিছু দেখছেন এবং ফেরেশতারা লিখছেন। শেষ বিচারের দিনে সব কিছুর হিসাব দিতে হবে। এই একটি গুণই যথেষ্ট আমাদের সমাজকে দুর্নীতি মুক্ত করতে।

রমজান ছিল কুরআন নাজিলের মাস। রোজার রাতে কষ্ট করে আমরা খতম করেছি গোটা কুরআন। কুরআন শুধু একটি তেলাওয়াত গ্রন্থ নয়। এটি সম্পূর্ণ কোড অব লাইফ বা জীবনযাপনের বাস্তব নির্দেশনা। রোজার বাইরেও চালু থাক কুরআনের শিক্ষা। সময় স্বল্পতার কারণে হয়ত রমজানে আমরা কুরআনের অর্থ বুঝার ফুরসত পাইনি। এখন থেকেই আমরা টার্গেট করতে পারি যাতে আগামী রমজান আসার আগেই সম্পূর্ণ কুরআন একবার হলেও অর্থসহ পড়তে পারি। কুরআন হোক আমাদের জীবন চলার ইমাম।

রমজানের সেহরীর শেষ সময়, ইফতারের শুরু আর নামাজগুলোর নির্দিষ্ট সময় আমাদের সময়ানূবর্তিতা ও শৃঙ্খলা শেখায়। রোজার বাইরেরও এই শিক্ষার প্রতিফলন হোক আমাদের সকল কাজকর্মে।

রমজান মাসে আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ধৈর্যের অনুশীলন করেছিলাম। দিনে সামনে হালাল ও সুস্বাদু খাবার থাকলেও আমরা তা গ্রহণ করিনি। বদ্ধ ঘরে যেখানে কেউ দেখবে না, সেখানেও পানাহার করিনি। কেন? কারণ সব সময় মনে হয়েছিল, কেউ না দেখলেও সর্বদ্রষ্টা আল্লাহ তো দেখছেন। রমজানের বাইরে এই শিক্ষা ও অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে আমরা হারাম উপার্জন ও হারাম খানা থেকে বাঁচতে পারি। সুদ-ঘুষের টাকা, অবৈধ চাঁদার টাকা আমাদের সামনে আসলে আমি নিজেকে সামলিয়ে রাখতে পারি রোজার সেই শিক্ষাকে স্মরণ রেখে।

রোজার মাসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার ব্যথা আমাদের ভুখা মানুষের কষ্ট বুঝতে সাহায্য করবে। তাছাড়া, এই মাসে আমরা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম সাহায্য-সহযোগিতার হাত। রোজার বাইরেও বন্ধ না হোক এই হাত। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। রমজান আমাদের সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছিল। আমাদের রোজার বাইরেও মনে রাখব যে, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো দয়া নয়; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি উত্তম মাধ্যম। আমরা যদি আন্তরিকতা সাথে সহায়তার হাত বাকি রাখি, তবে রমজানের প্রকৃত চেতনা আমাদের সমাজে বাস্তবায়িত হবে।

যদি আমরা রমজানে অর্জিত অভ্যাসগুলো, বিশেষত আল্লাহর ভয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য ও সহানুভূতির শিক্ষা বাকি জীবনে অব্যাহত রাখতে পারি, তাহলে আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিই অর্জন করব না, বরং নৈতিক, মানবিক ও সুস্থ সমাজ গঠন করতে পারব ইনশা-আল্লাহ।

লেখক : অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন